আমি ৩০ বছর বয়সী একজন নারী। আমাদের বিয়ে হয়েছিল আমার পছন্দে। সংসারও টিকে ছিল প্রায় ১০ বছর। আমাদের সংসারে চাঁদের মতো সুন্দর ফুটফুটে দু’টো ছেলে সন্তান আছে।
সব সংসারেই তো টুকটাক কিছু সমস্যা আছে, থাকে, থাকবেই। ওরকম আমাদের মধ্যেও মাঝেসাঝে টুকটাক ঝগড়া-ঝাটি হতো। কিন্তু ঝগড়া বাধলেই আমি বাক্সপেটরা গুছিয়ে ছেলেদের নিয়ে বাপের বাড়ির দিকে হাঁটা দিতাম। আর ও ছেলেদের দিতে চাইতোনা। বাপের বাড়িতে বোনরাও আসতো, আর ভাইরা তো ছিলই।
আমার কাছেও মনে হতো, ঠিকই করেছি। কত্তো বড় সাহস, আমার সাথে ঝগড়া লাগতে আসে। আমাকে তাঁর নিজের মতো করে চালাতে চায়। আমার মধ্যে সবসময় কেমন জানি একটা জেদ কাজ করতো। ওর কাছে ছোট হবো, ওর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে মাফ চাইবো, সরি বলবো, এটা ভাবতেই পারতাম না। উল্টো সবসময় গলা উঁচু করে বলতাম, “এখনই ডিভোর্স দাও! তোমার মতো লোকের সাথে সংসার করতে চাইনা”।
নাহ, ডিভোর্স আমি কখনোই মন থেকে চাই নি। ওটা ছিল মুখের কথা………..ওর সামনে ছোট হওয়া বা নতজানু হওয়ার চাইতে ডিভোর্স চাওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে আমার কাছে মনে হতো।
বলে রাখা ভালো, এর আগে কিংবা পরে কখনোই ও আমার গায়ে হাত তুলে নি। কিন্তু ঐ একটা থাপ্পড়ই ডিভোর্সের জন্য যথেষ্ট ছিলো।
বরাবরের মতো এবারও আমি বাক্সপেটরা গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলাম। আর হ্যাঁ সবসময়ের মতো এবারও নিজের দোষ না বলে খালি ওর দিকটাই বলে গেলাম। মানুষের দোষ দিয়ে আর কী লাভ? সবাইকে যা বলেছি, সেটার উপর ভিত্তি করেই তারা বিচার করেছে। পরিবারের সবাই বললো, এমন ছেলের সাথে সংসার করার কোনো দরকার নাই। কোর্টে মামলা ঠুকে দাও।
আমার পরিবারের সবার কূট পরামর্শ শুনে, আমি ওর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করলাম। আহা! এটাই ছিলো আমার জীবনে করা সবচাইতে বড় ভুল।
মূলত স্বামীর কাছে ডিভোর্স চাইলে অধিকাংশ নারীরা মামলা জিততে যৌতুক সহ নারী নির্যাতনের মামলা করে থাকেন। আমিও তাদের দেখানো পথেই হাটলাম। ওর নামে যৌতুক সহ নারী নির্যাতনের কেইস করলাম। অথচ ও কিন্তু কখনোই যৌতুক চায়নি। খুব দ্রুতই ওকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। ওর পরিবার থেকে মুরুব্বিরা এসে বার বার আমাকে অনুরোধ করল, আমি যেন এই কেইস তুলে নিই।
আমার বাবা-মা আমাকে বুঝিয়েছিলো, আমি যদি এতকিছুর পরও তার কাছে ফিরে যাই, তাহলে ও ভাববে, আমি বুঝি অসহায়। আমাকে আরো পেয়ে বসবে। ও আমার উপর ইচ্ছামত ছড়ি ঘুরাবে। একবার থাপ্পড় মেরেছে মানে বার বার একই কাজ করবে। কাজেই নিজে থেকে ফিরে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না..……
কিন্তু আমার মনের ভেতর কে যেন চিৎকার করে বলতো, ও তো এমন লোক না। ও যেদিন আমার গায়ে হাত তুলেছিল, সেদিনই আমার কাছে করজোড়ে মাফ চেয়েছে, সরি বলেছে। এসব ভেবে ভেবে আমি মামলা তুলে নিলাম ঠিকই কিন্তু ওর কাছে ফেরত গেলাম না। বাপের বাড়িতেই রয়ে গেলাম।
কিছুদিন পর দুই পরিবার থেকে বিচার-সালিশ হল। আমাকে থাপ্পড় মারার অপরাধে সবার কাছে ও দোষী প্রমাণিত হল। সবাই ওকে নানা কথা বলে বোঝালো, উপদেশ দিল। তারপর আবার আমরা সংসার শুরু করলাম।
এর পরের কয়েক মাস আমাদের সংসার ভালোই চলছিল, আমিও ওর কাছে ওয়াদা করেছিলাম যে, আর কখনো ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করবোনা, অহেতুক সন্দেহ করবোনা। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় হুট করে আবার কী একটা বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে চরম ঝগড়া বেঁধে গেলো। ব্যস, কাপড়চোপড় গুছিয়ে আবার আমি বাপের বাড়ি গিয়ে উঠলাম।
এর কিছুদিন পরেই শুনলাম ও নাকি খুব অসুস্থ ! আমি বাসায় ফিরতে চাইলেও আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বললো, এভাবে একটা ঝগড়ার পর একা একা স্বামীর কাছে ফিরে গেলে সেটা ভালো দেখায় না। আর আমার মা-বাপ ও ভাই-বোনদের কথা ছিল, ওসব অসুস্থ-টসুস্থ কিছু না, সব বাহানা!
আমার পরিবার ও আমি চাচ্ছিলাম ঐ পক্ষ থেকে কিছু আত্মীয়-স্বজন এসে ওর ভুল স্বীকার করে আমাকে হাতে-পায়ে ধরে নিয়ে যাক। কিন্তু এবার কেউই আসলো না….……
এরও কিছুদিন পর ও আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল। ডিভোর্স লেটার দেখে আমাদের পরিবারের সবাই খুব বেশি ক্ষেপে গেলো। কতবড় সাহস, মেয়েকে এত কষ্টে রেখেছে, তার উপর আবার ডিভোর্স লেটার পাঠায়???
পরিবারের সবার কথায় আমার কাছেও মনে হলো, ঠিকই তো, কত বড় সাহস ওর! আমাকে ডিভোর্স দিতে চায়? ওর ছোট -খাটো সব ভুলগুলো আমার চোখের উপর ভাসতে লাগলো। এর উপর মা-বাবা আবার মনে করিয়ে দিলো, ও হলো সেই ছেলে যে কিনা আমার গাঁয়েও হাত তুলেছে।
প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে আমিও ঠিক করলাম, এবার ডিভোর্সই দেবো। কে চায় এমন ফালতু স্বামীর সংসার করতে? কোর্টে গিয়েও ওকে হেনস্থা করার চেষ্টা করলাম। আমার মাসিক খরচ বাড়িয়ে একটা আকাশছোঁয়া টাকার অংক দাবি করলাম! আমি চাচ্ছিলাম ওর যেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। যেন নিজে থেকে আমার কাছে এসে মাফ চেয়ে আবার সংসার করতে চায়।
আসলে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাক, এটা আমি মন থেকে কখনোই চাই নি৷ কিন্তু আমার ভিতরের জিদ আমাকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে নিচ্ছিল। আগ বাড়িয়ে ওকে ডিভোর্স তুলে নিতে বলা আমার পক্ষে অসম্ভব! ওর কাছে ছোট হওয়া আমি মানতেই পারি নি কখনো!
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ও আমার আকাশছোঁয়া সমস্ত দাবি-দাওয়া মেনে নিলো। আমাদের ছেলেদের আমি পেয়ে গেলাম। ভরণপোষণ, মাসিক খরচ, ওর সম্পত্তি সব! বিনিময়ে ও পেলো শুধুই ডিভোর্স।
আমাদের ডিভোর্স হয়েছে আজ ৫ বছর………
আমার প্রাক্তন স্বামী আবারও বিয়ে করেছে। ও খুব সুখেই আছে এটা দেখলেই বোঝা যায়। আসলে ওর মতো নির্ঝঞ্ঝাট স্বামীকে নিয়ে মেয়েরা সুখে থাকবে এটাই স্বাভাবিক, শুধু আমিই মানিয়ে নিতে পারলাম না। এটা আমার চরম ব্যর্থতা।
এখন আমার নিজের কথা ভেবে ভেবে খুব আফসোস হয়। আসলে মানুষের মুখের কথা কখনো কখনো ছুরির চেয়েও অধিক ধারালো হতে পারে। ও আমাকে একবার থাপ্পড় মেরেছিল ঠিকই, কিন্তু আমি সবসময় কথার তীরে ওকে ছিন্নবিছিন্ন করে ফেলতাম। শারীরিক নির্যাতন করিনি সত্যি, কিন্তু মানসিকভাবে ওকে ভীষণ কষ্ট দিতাম। সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে রাতে বাসায় ফিরলেই তাকে নানারকম কথার তীরে বিদ্ধ করতাম। ওর সাথে করা আমার এসকল ভুলের কথা আমার মা বাবাকে কখনোই আমি বলিনি। নিজের দোষের কথা মানুষ কতটুকুই বা স্বীকার করে????
আমার মা-বাবাও কখনো আমাকে শাসন করেনি। আমি দেখেছি আমার মাও বাবার সাথে এমন আচরণই করতো। তাই আমি ভাবতাম পুরুষ মানুষকে বুঝি সবসময় টাইট দিয়েই রাখতে হয়।
মাঝে মাঝে ভাবি, ইশ, আমার পরিবার যদি একটু নিজে থেকে বুঝিয়ে আমাকে সংসার করার উপদেশ দিতো!!!
যখন আমি ওর কাছে ফিরে যেতে চাইতাম, তখন আমার পরিবার ওর খারাপটা না বলে যদি একটু ভালো দিকগুলোর কথা মনে করাতো! আমি যদি নিজের জিদ নিয়ে পড়ে না থেকে, একটু ওর কাছে নত হতাম! তাহলে হয়তো আজ আমাকে এই দিন দেখা লাগতো না। ছোট থেকে এই পর্যন্ত আমার মা-বাবা, ভাই-বোন কখনোই আমাকে সেরকম শাসন করেনি। তাই কিসে ভালো আর কিসে মন্দ হবে সেটা বুঝতেও পারিনি।
যেই মা-বাপ আর ভাই- বোন এবং দুলাভাইদের কূপরামর্শ শুনে আজ আমার এই পরিনতি, তারা কিন্তু সবাই খুব সুখেই আছে। মাঝখান থেকে আমি আমার সংসার হারালাম। তাদের কথা শুনে লোভে পড়ে মামলা দিয়ে ওর সহায় সম্পত্তি সবকিছুই কেড়ে নিলাম।
আসলে সবটুকু ভুল আমারই ছিলো। ঐ-যে কথায় আছেনা, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়, আমার অবস্থাও হয়েছিলো সেরকম। শয়তান কিসে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় জানেন? কারো সংসারে ঝগড়া বাঁধিয়ে স্বামী – স্ত্রীর ডিভোর্স করাতে পারলে। তাই স্বামীর কাছ থেকে ডিভোর্স নেয়ার আগে কমপক্ষে কয়েক লক্ষবার ভাবুন।
ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিওনা।
আজ আমার ভাই-বোন বন্ধুবান্ধব সহ সবার নিজেদের সংসার আছে কিন্তু ছোট্ট একটি ভুল ও লোভে পড়ে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। তাই বিধাতার কাছে দোয়া করি, আমার মতো আর কারো জীবনে এমন ঘটনা না ঘটুক।
Leave a Reply