ব্রিটেনে শতাব্দীর সেরা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে আজ রানীর শেষ যাত্রা বা রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্যের চূড়ান্ত পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে। আজ ১৯ সেপ্টেম্বর (সোমবার) শুধু যুক্তরাজ্যের জাতীয় শোক প্রকাশের উপলক্ষই নয়, বরং একই সঙ্গে হয়ে উঠছে সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাঁকজমকপূর্ণ কূটনৈতিক সমাবেশ।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্যের আয়োজনটিতে সারা বিশ্বের বাদশাহ, সম্রাট, রাজা-রানি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের যেমন মহামিলন ঘটবে, তেমনই এটিকে জাতীয় ঐক্যের স্বাক্ষর হিসেবে প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাকিংহাম প্যালেসে গতকাল রাতে সারা বিশ্বের আমন্ত্রিত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ এই প্রথমবারের মতো একত্রিত হয়েছেন। রাজা তৃতীয় চার্লসের আমন্ত্রীত এক সংবর্ধনায় তারা একত্রিত হয়েছেন। আজ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর দ্বাদশ দিনে তাঁরা ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তাঁর জন্য আয়োজিত রাষ্ট্রীয় প্রার্থনায় অংশ নেবেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রানীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য লন্ডনে সমবেত হচ্ছেন। সারা বিশ্বের প্রায় ৫০০ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাজপরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রানীর শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার জন্য এরই মধ্যে লন্ডনে পৌঁছেছেন। তিনি গত রোববার পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক ওয়েস্টমিনস্টার হলে রানীর কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
২ হাজার অতিথি ও ৪ হাজার সেবক শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে এ অনুষ্ঠান দেখবেন। আজ রানীর শেষ যাত্রা

রাজা তৃতীয় চার্লস এবং তার বড় ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম শনিবার অঘোষিত সফরে লাইনে অপেক্ষমান থাকা লোকদের অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁদের সঙ্গে করমর্দন করেন। জনসাধারণ আজ সকাল পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন।

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে বিবিসি ২১ শতকের ‘অতুলনীয়’ ঘটনা হিসেবে অভিহিত করছে। একজন কূটনীতিক বলেছেন, ‘এটি এই শতাব্দীর (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) শেষকৃত্য। প্রত্যেক বিশ্বনেতা এটি দেখতে এবং তাঁকেও যেন দেখা যায় তা চাইবেন। যাঁরা এখানে উপস্থিত থাকবেন না, তাঁরা আমাদের এই সময়ের সেরা ফটোসেশনের সুযোগ হারাবেন।
বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকগণ বলছেন, রানীর সুদীর্ঘ রাজত্বকাল ও তাঁর কূটনৈতিক খ্যাতি ছিল অতুলনীয়। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই শেষ যাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে, যার সঙ্গে সাম্প্র্রতিক কোনো আয়োজনের তুলনাই হবে না। রানীর মৃত্যুর পর ব্রিটেনে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে তার নিখুঁত পরিকল্পনায় জীবদ্দশাতে রানী নিজেও ছিলেন।
শেষকৃত্যের জন্য রানীর কফিনটি আজ নিকটবর্তী ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে স্থানান্তরিত হবে। এর মাধ্যমে ব্রিটেনের দীর্ঘতম রাজত্বকারী রানীর জন্য ১০ (দশ) দিনের জাতীয় শোকের পরিসমাপ্তি ঘটবে। অ্যাবেতে ধর্মীয় আচারাদী পালনের পরে রানীর কফিনটি ঘোড়ায় টানা গাড়িতে লন্ডনের ঐতিহাসিক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর উইন্ডসরে নিয়ে যাওয়া হবে উইন্ডসরে। সেখানে তাঁর প্রয়াত স্বামী ফিলিপের সঙ্গে রানীকে সমাহিত করা হবে।

কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীগণ রানীর শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে ও এ-ই শতাব্দী সেরা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও উক্ত শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মেক্রো, জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টেইনমায়ার এবং ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেলাও শেষ যাত্রার উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সমগ্র ইউরোপজুড়ে রাজপরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।
তবে সবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল গতকাল বাকিংহাম প্যালেসে রাজা ৩য় চার্লস আয়োজিত রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটির প্রতি। বিভিন্ন দেশের রাস্ট্র নেতাদের জন্য এটি তাদের সম্মিলিতভাবে দেখা করার এবং কূটনীতিতে জড়িত হওয়ার একমাত্র সুযোগ ছিলো।
রানীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স এবং শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানকে আমন্ত্রণ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ও মানবাধিকারকর্মীরা চীন সরকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের কারণে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোরও বিরোধিতা করেছেন।
রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছোট বোন শেখ রেহানা এবং লন্ডনে থাকা বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিমকে সঙ্গে নিয়ে ঐতিহাসিক ওয়েস্টমিনিস্টার হলে যান শেখ হাসিনা। পরে ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে খোলা শোক বইয়েও তিনি স্বাক্ষর করেন।
শেখ হাসিনা সদ্য প্রয়াত রানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। ব্রিটিশ স্পিকারের প্রতিনিধি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর ছোট বোনকে স্বাগত জানান। শোক বইয়ে বাংলায় শোকবার্তা লেখেন শেখ হাসিনা। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশের জনগণ, আমার পরিবার এবং আমার ছোট বোন শেখ রেহানার পক্ষ থেকে রানীর জন্য গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
এরপর ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকি ফোর্ড তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, প্রয়াত রানীর সঙ্গে ৮-৯ বার দেখা করেছিলেন এবং রানী তাঁকে তাঁর প্রথম নামেই চিনতেন।
সূত্র : বিবিসি, এপি, এএফপি ও বাসস।
Leave a Reply